Breaking News
Home / শিল্প ও সাহিত্য / সুরমা : সিলেটের নেকলেস

সুরমা : সিলেটের নেকলেস



বাংলা প্যারিস ওয়ার্ল্ড: ২৫/০১/২০২০



সুরমা : সিলেটের নেকলেস
ফায়সাল আইয়ূব

পৃথিবীর সব বড় শহর-নগর-বন্দর কোনও না কোনও নদীর পাশে। ঘুরিয়ে বললে— নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বেশির ভাগ বাণিজ্যকেন্দ্র, আবাসস্থল; নগরসভ্যতা। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের হাডসন নদীর পাশে নিউইয়র্ক, যুক্তরাজ্যের টেমস নদীর পাশে লন্ডন, ফ্রান্সের সেইন নদীর পাশে প্যারিস, ভারতের যমুনার পাশে দিল্লি, বাংলাদেশের বুড়িগঙ্গার পাশে ঢাকা, তেমনি সুরমার পাশে সিলেট শহর। এর অনেক কারণ রয়েছে। অন্যতম কারণ, পণ্যের আমদানি-রপ্তানি তথা পরিবহন। যে সময় গাড়ি আবিষ্কার হয়নি, সেই সময় হাতি-ঘোড়া-উট-গাধার পাশাপাশি নৌকাও ছিলো। নৌকা পৃথিবীর আদি বাহনগুলোর অন্যতম। বেশির ভাগ জলপথ এবং সড়কপথ না-থাকায় নৌকাই ছিলো মানুষের সবচেয়ে কাছের বাহন। হযরত নূহ আলাইহিস সালামের নৌকার কথা কে না জানে।

ক্বিনব্রিজ

২০১৪
খ্রিস্টাব্দ নূহ আলাইহিস সালামের কাহিনী অবলম্বনে নোয়াহ নামে হলিউড একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে। রাসেল ক্রু, ইমা ওয়াটসনসহ আরও অনেক শিল্পী এতে অভিনয় করেছেন। ২৮ মার্চ (২০১৪ খ্রিস্টাব্দ) ছায়াছবিটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুক্তি পায়।

এই নৌকা বা জাহাজই ছিলো এক সময়ের পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। দ্রুত গতির গাড়ি আবিষ্কারের পর অপেক্ষাকৃত কম গতিসম্পন্ন এই বাহনের কদর কিছুটা কমে যায়। এরপরও এই একুশ শতকেও নৌকা বা জাহাজ একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। বিশেষ করে ছোট বড় ৮০০ নদীর বাংলাদেশে তো নয়ই। মূলত এ কারণেই বলা হয় বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার নদীপথের বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ এখনও নৌকার ওপর নির্ভরশীল; তাঁরা নৌকা দিয়ে মাছ ধরেন, পণ্য পরিবহন করেন। নদী পারাপারে এই নৌকা খেয়া হিশেবেও ব্যবহার হয়ে থাকে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন নদীতে লাখ লাখ মানুষ এই নৌকা দিয়ে নদী পার হন। সেখান থেকেও কোটি মানুষের ভাত-কাপড়ের অর্থ আসে। এগুলোর মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বড়ো অংশ জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। হাতে চালিত এই নৌকা ধোঁয়াহীন ও শব্দহীন হওয়ার ফলে পরিবেশবান্ধব। যদিও ইদানীং অনেক নৌকা আর বৈঠায় চলে না, চলে ভটভটি ইঞ্জিনের সাহায্যে!

আলী আমজদের ঘড়ি

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম বড়ো ও গুরুত্বপূর্ণ শহর সিলেট। একে সিলেট বিভাগের (১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে বিভাগীয় মর্যাদায় উন্নীত হয় সিলেট) রাজধানীও বলা যেতে পারে। এই সিলেট নামটি উচ্চারণের সাথে সাথে চা-বাগানের পাশাপাশি মনের পর্দায় ভেসে ওঠে নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম নদী সুরমার ছবি। বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর অন্যতম এই সুরমা। উত্তর পূর্ব ভারতের বরাক নদী বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী উপজেলা শহর জকিগঞ্জের দিকে প্রবেশ করে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুটি শাখানদীতে বিভক্ত হয়।

মণিপুর পাহাড়ের মাও সংসাং হতে বরাক নদীর উৎপত্তি। বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশের পর দক্ষিণের শাখা কুশিয়ারা আর উত্তরের শাখা সুরমা নামে বিভক্ত হয়। সুরমা সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা পাড়ি দিয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরববাজারের কাছে মেঘনায় মিশেছে। মেঘনা পতিত হয় বঙ্গোপসাগরে।

মিশরের নিল নদ যেভাবে পৃথিবীর দীর্ঘ (৬ হাজার ৬৫০ কিলোমিটার) নদী, মিসিসিপি যেভাবে আমেরিকার দীর্ঘ নদী (৬ হাজার ২৭৫ কিলোমিটার) তেমনি বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী (৯০০ কিলোমিটার) সুরমা। বর্ষাকালে সুরমা নদীর সর্বোচ্চ গভীরতা ৫৫০ ফুট বা ১৭০ মিটার হলেও গড় গভীরতা ২৮২ ফুট বা ৮৬ মিটার। তবে এগুলো শুধু কথার কথা এখন। নেই সেই গভীরতা, নেই তার উতলা যৌবন। নাব্যহ্রাসের ফলে শীত মৌসুমে এই সুরমা ছোট্ট খালে রূপান্তর হয়; খেয়ার বদলে তখন কেউ কেউ লুঙ্গি কাছা মেরে নদী পার হয়ে যান অবলীলায়! নদীশোষণ, ময়লাদোষন, আবর্জনা ফেলা এবং নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়ায় সুরমা ক্রমে তার জৌলুশ হারাতে বসেছে। এরপরও এই সুরমা যেনো পাহাড়-টিলার মনোহারী শহর সিলেটের গলায় লেপ্টে থাকা এক অনিন্দ্যসুন্দর রূপার নেকলেস; যার লকেট ধনুক আকৃতির লাল ক্বিনব্রিজ ও আলী আমজাদের লাল ঘড়িঘর। শরত-হেমন্তের জোছনাপ্লাবিত রাতে যে কিনা ঘুঙুর পায়ে নেচে ওঠে উদ্ভিন্ন যৌবনা লক্ষ্ণৌ বাইজির মতো।

তাই বলা যায়, হাজার বছর ধরে এই সুরমা সিলেটে যোগান দিয়ে চলেছে এক অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এখন থেকে প্রায় ৮০০ বছর আগে এই নদী পার হয়ে ইয়েমেন থেকে সিলেটে এসেছিলেন হযরত শাহজালাল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। নিজের বাড়ির (ভার্থখলার খান মঞ্জিল) পাশের এই নদীর সৌন্দর্য হৃদয়ঙ্গম করেই গণমানুষের কবি দিলওয়ার লিখেছিলেন ‘ক্বিনব্রিজে সূর্যোদয়’ নামের বিখ্যাত কবিতা।

এই সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত সার্কিট হাউজকে নান্দনিক স্থাপত্যে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সার্কিট হাউজের সামনের সুপরিসর চত্বরটিও নয়নাভিরাম করে গড়া হয়েছে। মসৃণ ঘাসের সবুজ চত্বরের উত্তর-পশ্চিম কোণায় বানানো ছোট্ট এক টিলা সার্কিট হাউজের ভিতরে নিয়ে এসেছে সিলেটের প্রাকৃতিক বৈচিত্র। একই সঙ্গে চাঁদনীঘাট এলাকাসহ সুরমার তীরকে লন্ডনের টেমস নদীর আদলে পাকা করে বাঁধানো হয়েছে। দেওয়া হয়েছে রূপালি স্টিললের বেষ্টনি। লাগানো হয়েছে দৃষ্টিনন্দন বৃক্ষরাজি ও ভিক্টোরিয়ান আমলের ঐতিহ্যবাহী আলোকস্তম্ভ।

ক্বিনব্রিজের একেবারে পাশে স্থাপিত স্টিলের গোলাকার ভাস্কর্যটি চাঁদনীঘাট এলাকাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এসব কারণে এখানে প্রতিদিন বিনোদন ও প্রকৃতিপ্রেমি হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। এই নদীতে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে আয়োজন করা হয় নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার। এতে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকার শতাধিক নৌকা অংশ নেয়। বিভিন্ন নাম ও রঙের নৌকা প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে ওই দিন নদীর দুই তীরে জমায়েত হন হাজার হাজার মানুষ। হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শেষে চাঁদনীঘাটের সিঁড়ি দিয়ে নেমে প্রতিবছর সুরমা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। ওইদিন সন্ধ্যায়ও ওই এলাকা লোকারণ্য হয়। ট্রাক মিছিল আর ঢাক-ঢোলে মেতে ওঠেন পূণ্যার্থীরা।

চাঁদনীঘাট এলাকাসহ পূর্বকাজির বাজার এলাকায় আরও আছে জালালাবাদ (সিলেটের আরেক নাম) পার্ক, ঐতিহ্যবাহী শারদা স্মৃতি ভবন, পীর হবিবুর রহমান সিটি পাঠাগার (যার আগের নাম ছিল পৌর পাঠগার), বনবিভাগের বিভাগীয় অফিস, কোতোয়ালী থানা, সড়ক ও জনপথ অফিস, তোপখানা ওয়াটার সাপ্লাই কেন্দ্র, ভূমি জরিপ অফিস। উল্লেখ্য, ডক্টর ফখরুদ্দিন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের ২৩ অক্টোবর রাতে চাঁদনীঘাট থেকে পূর্বকাজির বাজারের তোপখানা পর্যন্ত নদীতীরে গড়ে ওঠা অর্ধশতাধিক কাচা দোকান ভেঙে ফেলা হয়। এর আগে নদীতীরবর্তী এই দোকানগুলোয় শিল-পাটা, মাটির তৈরি জিনিসপত্র যেমন শানকি, পাতিল, সরা, ফুলের টব, মাটির আম-কাঠাল-গরু-ঘোড়া, বাঁশ-বেতের জিনিসপত্র যেমন চাটাই, টুকরি, কোলা, খলুই, মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ, লোহার জিনিসপত্র যেমন দা-কুড়াল-কাস্তে-চাকু-কড়াই-তাওয়া, নারকেল-সুপারি বিক্রি হত। পববর্তীতে ব্লক দিয়ে নদীতীর বাঁধাইসহ এই এলাকার সৌন্দর্যবর্ধন ও আধুনিকায়নে ব্যয় করা হয় শতকোটি টাকা।

• ক্বিনব্রিজ

এই সুরমা নদীর ওপর রয়েছে ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশিল্প ক্বিনব্রিজ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে আসাম প্রদেশের গভর্নর (১৯৩২ থেকে ১৯৩৭) স্যার মাইকেল ক্বিন সিলেট সফরে আসার জন্য সুরমা নদীতে একটি ব্রিজ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তখন বৃহত্তর সিলেট জেলা ছিলো আসাম প্রদেশের অর্ন্তভুক্ত। আসামের সাথে সিলেটের যোগাযোগের মাধ্যম ছিলো ট্রেন। ফলে, রেলওয়ে বিভাগ ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে সুরমা নদীতে ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় এবং তিন বছরের মধ্যে এর কাজ শেষ হলে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিজটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়। ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে লোহা ও স্টিল দিয়ে নির্মিত লাল রঙের এই ব্র্রিজের দৈর্ঘ্য ১১৫০ ফুট ও প্রস্থ ১৮ ফুট। তৎকালীন আসাম সরকারের এক্সিকিউটিভ সদস্য রায় বাহাদুর প্রমোদ চন্দ্র দত্ত এবং শিক্ষামন্ত্রী আব্দুল হামিদ ব্রিজটি নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখেন। পরবর্তীতে গভর্নর মাইকেল ক্বিন সিলেট সফর করেন। মূলত তাঁর স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতেই এর নাম রাখা হয় ক্বিনব্রিজ।

১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিজটি তৈরি হলেও আজও তা টিকে আছে। যদিও এই টিকে থাকার পেছনে কয়েকবারের মেরামত নিয়ামক শক্তি যোগান দিয়েছে। এই ব্রিজ শহরের দক্ষিণ ও উত্তরকে ৭৮ বছর ধরে ভালোবাসার বন্ধনে যেনো দম্পতি করে রেখেছে। এই ক্বিনব্রিজকে বলা হয় সিলেটের প্রবেশপথ। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ডিনামাইট মেরে ব্রিজটির ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে পাকিস্তানী আর্মি। মুক্তিযুদ্ধের পর ভারতীয় মিত্রবাহিনী কাঠ দিয়ে ব্রিজটি হালকা যান চলাচলের উপযোগী করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের কয়েক মাসের মধ্যে মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যায়। এভাবে কয়েক বছর চলার পর ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ রেলওয়ের সহযোগিতায় ব্রিজটির বিধ্বস্ত অংশটি কংক্রিট দিয়ে পুনঃনির্মাণ করা হয় এবং নৌবাহিনীর তৎকালীন প্রধান রিয়ার এডমিরাল এম এইচ খান সংস্কারকৃত ব্রিজটি উদ্বোধন করেন।

২০১৯ খ্রিস্টাব্দে সিটি মেয়র আরিফুল হকের আন্তরিকতায় এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় এই ব্রিজে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে বর্তমানে ক্বিনব্রিজ রূপান্তরিত হয়েছে ওয়াকিংব্রিজে; এমন ব্রিজ উন্নতবিশ্বের বহু দেশে রয়েছে।

ঐতিহাসিক এই ক্বিনব্রিজকে মধ্যমণি করে সিলেট শহর ও শহরতলীতে আরও চারটি সেতু তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উজানে শাহ জালাল ও শাহ পরান সেতু এবং ভাটিতে কাজিরবাজার সেতু ও টুকেরবাজার সেতু। এই পাঁচ সেতু বিভাগীয় শহর সিলেটকে দক্ষিণের সাথে রীতিমত জুড়ে রেখেছে।

• আলী আমজাদের ঘড়ি

এই ব্রিজের উত্তর পাশে চাঁদনিঘাটের সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে সিলেটের আরেক ঐতিহ্য, আলী আমজাদের ঘড়িঘর। এটি সিলেট শহরে ঊনবিংশ শতকের একটি স্থাপত্যশিল্প, যা একটি চৌকোণ ঘরের চূড়ায় স্থাপিত বিরাট আকারের ঘড়ি। এর ডায়ামিটার আড়াই ফুট এবং ঘড়ির কাঁটা দুই ফুট লম্বা। যখন ঘড়ির অবাধ প্রচলন ছিল না, সেসময় অর্থাৎ ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে সিলেট মহানগরীর প্রবেশদ্বার ক্বিনব্রিজের পাশে সুরমা নদীর তীরে ঘড়িঘরটি নির্মাণ করেন মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার পৃথ্বিমপাশার জমিদার আলী আমজদ খান। লোহার খুঁটিতে ঢেউটিন পেঁচিয়ে তৈরি গম্বুজ আকৃতির ঘড়িঘরটি তখন থেকেই আলী আমজদের ঘড়িঘর নামে পরিচিতি লাভ করে।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হানাদার পাকিস্তানী আর্মির গোলার আঘাতে এই প্রাচীন ঘড়িঘরও বিধ্বস্ত হয়। মতান্তরে মুক্তিযোদ্ধারাই কৌশলগত কারণে ব্রিজটি একাংশ উড়িয়ে দেন। এ সময় ঘড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয় ।

স্বাধীনতার পর সিলেট পৌরসভার (স্থাপিত হয়েছিল ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে; ২০০২ সাল থেকে সিটি করপোরেশন) প্রথম চেয়ারম্যান বাবরুল হোসেন বাবুল ঘড়িটি মেরামতের উদ্যোগ নেন। তাঁর এই উদ্যোগের ফলে ঘড়িটি আবার আগের আদলে দাঁড়ায় এবং এর কাঁটা ঘুরতে শুরু করে। যদিও কিছুদিনের মাথায় এই ঘুর্ণনক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। ২৬ ফুট উচু ঘড়িঘরটির প্রস্থ ৮ ফুট ১০ ইঞ্চি।

১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে আলী আমজদের ঘড়ি মেরামত করে পুনরায় চালু করা হয়। এ সময় ঢাকার একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠান ঘড়িটি চালু রাখার জন্য রিমৌট কন্ট্রোলের ব্যবস্থা করে দেয়। তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যানের অফিসকক্ষ থেকে ঘড়িটি নিয়ন্ত্রণ করা হত। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই ঘড়ির কাঁটা আবার বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সিজান নামের একটি কোম্পানি ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে ঘড়িটি পুনরায় চালু করে। বছর না ঘুরতেই ঘড়িটির কাঁটা আবারও অচল। এভাবে সচল-অচলের মধ্য দিয়ে ঘড়িটি রোদ-বৃষ্টি-ঝড় মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে যুগ যুগ ধরে।

২০১১ খ্রিস্টাব্দে সিলেট সিটি কর্পোরেশন এই ঘড়িটিকে পুনরায় মেরামত করলে তা আবারও সচল হয়। সর্বশেষ এই মেরামতকালে ঘড়িটির উচ্চতা বাড়ানো হয়, ডায়ামিটার শাদার বদলে কালো করে দেওয়া হয়। এ নিয়ে সিলেটের সচেতন মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আফসোসের বিষয়, ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চের কোনও এক দিন অথবা রাতের সাড়ে আটটায় ঘড়ির কাঁটাটি থেমে যায়। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল পর্যন্ত কাঁটাটি ওই সাড়ে আটেই আটকে ছিলো । ঘড়িটির এই অবস্থা দেখে শহরের অনেক বাসিন্দাই মনে করেন এটি বুড়ো হয়ে গেছে, আর চলবে না। ঘড়িটি কাঁটা না-চললে কি হবে, সৌন্দর্যপিয়াসীরা এর ছবি তুলতে ভুলেন না; কারণ, স্থিরচিত্রে জগতের সকল অস্থিরতাও সু্স্থির হয়ে যায় ।

ঐতিহাসিক এই ঘড়িকে কেন্দ্র করে সিলেটে একটি প্রবাদ চালু আছে। এটি এরকম : ‘আলী আমজদের ঘড়ি/জিতু মিয়ার গাড়ি ও বঙ্ক বাবুর দাড়ি।’

About banglaparisworld

Check Also

রাতারগুল

আবদুল হকবাংলা প্যারিস ওয়ার্ল্ড: ১৯/০১/২০২০ রাতারগুল বাংলাদেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট—মিঠেপানির জলাবন। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বিচিত্র …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *